08
Jul
আদর্শ সন্তান গঠনে অভিভাবকের ভূমিকা ও ইসলামি প্যারেন্টিং
আসসালামু আইলাইকুম, আজ আলোচনা করবো আদর্শ সন্তান গঠনে অভিভাবকের ভূমিকা ও ইসলামি প্যারেন্টিং ইন শা আল্লাহ্। সন্তান মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য এক অনন্য নেয়ামত এবং একই সাথে একটি বিশাল আমানত। আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে আমাদের সন্তানদের সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং তাদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা অভিভাবকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ব্লগে আমরা আলোচনা করব কীভাবে ইসলামি প্যারেন্টিংয়ের মাধ্যমে আমরা আমাদের সন্তানদের দুনিয়া ও আখিরাতে সফল করে গড়ে তুলতে পারি।
১. প্যারেন্টিং: একটি আমানত ও জবাবদিহিতা
প্যারেন্টিং বা সন্তান প্রতিপালন কেবল একটি সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সন্তান দিয়েছেন এবং এটি একটি আমানত হিসেবে আমাদের কাছে রাখা হয়েছে । এই আমানতের ব্যাপারে আমাদের আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কুরআনের সূরা তাহরিমের একটি আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো”।
আমাদের মূল লক্ষ্য কেবল সন্তানকে জান্নাতে পাঠানো নয়, বরং তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানো। এটি আমাদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'গোল' বা লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তাই সন্তান প্রতিপালনে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এই লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় ।
২. আধুনিক চ্যালেঞ্জ ও ইসলামি প্যারেন্টিংয়ের প্রয়োজনীয়তা
আজ থেকে ১০-১৫ বছর আগেও প্যারেন্টিংয়ের ক্ষেত্রে যেসব চ্যালেঞ্জ ছিল না, বর্তমানে তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে অভিভাবকদের। উদাহরণস্বরূপ, স্ক্রিন বা ইলেকট্রনিক ডিভাইসের আসক্তি এবং বর্তমানে মুসলিম পরিবারগুলোতেও ছড়িয়ে পড়া এলজিবিটিকিউ (LGBTQ) ইস্যুগুলো এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ।
অনেকে মনে করেন যে, প্যারেন্টিংয়ের ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলো অনেক এগিয়ে আছে। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, প্যারেন্টিং বিষয়ে ইসলামে প্রচুর দিকনির্দেশনা ও জ্ঞান রয়েছে, যা পশ্চিমা দর্শনের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর এবং শাশ্বত । আধুনিক যুগের এসব ফিতনা থেকে সন্তানদের রক্ষা করতে হলে আমাদের অবশ্যই ‘জেনারেল প্যারেন্টিং’ থেকে বেরিয়ে ‘ইসলামিক প্যারেন্টিং’ বা মুসলিম পরিবার হিসেবে সন্তান গড়ার পদ্ধতির দিকে মনোযোগ দিতে হবে ।
৩. শৈশবে শিক্ষার অগ্রাধিকার: ঈমান ও আখলাক
একটি শিশুর জীবনের ভিত্তি গড়ে ওঠে তার শৈশবে। ইসলামি নির্দেশনানুযায়ী, একটি শিশুর জন্য সাত বছর বয়সের আগে সালাত বা নামাজের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তার আদব-কায়দা, সুন্দর আচরণ এবং ঈমান শিক্ষা দেওয়া ।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি যে, একজন নারী অনেক নফল সালাত ও সিয়াম পালন করেও যদি তার আচরণ বা কথার মাধ্যমে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেন, তবে তিনি জাহান্নামী। অন্যদিকে, একজন নারী কেবল ফরজ ইবাদতগুলো পালন করেও যদি তার ব্যবহারের মাধ্যমে কাউকে কষ্ট না দেন এবং মিষ্টভাষী হন, তবে তিনি জান্নাতি । এখান থেকে বোঝা যায়, সন্তানদের শৈশবে উত্তম আখলাক বা চরিত্রের ওপর জোর দেওয়া কতটা জরুরি। উত্তম আচরণ শিখলে আল্লাহ তার অন্তরকে দ্বীনের দিকে ধাবিত করেন।
৪. পরিবার: শিশুর প্রথম বিদ্যাপীঠ
সন্তানের জন্য পৃথিবীর প্রথম স্কুল হলো তার পরিবার এবং প্রথম শিক্ষক হলেন তার বাবা-মা। অনেকে মনে করেন সন্তানকে কোনো নামী ইসলামিক স্কুলে ভর্তি করে দিলেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। শিশু স্কুলে যতটুকু সময় কাটায়, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় কাটায় বাড়িতে ।
স্কুলে হয়তো আত্মীয়-স্বজনের সাথে ভালো ব্যবহারের হাদিস পড়ানো হয়, কিন্তু তার বাস্তব প্রয়োগ ঘটে বাড়িতে । বাড়িতে যখন দাদা-দাদি, নানা-নানি বা কোনো আত্মীয় আসেন, তখন বাবা-মা তাদের সাথে কেমন ব্যবহার করছেন, তা দেখেই শিশু প্রকৃত দ্বীন শেখে । তাই সন্তানকে দ্বীন শেখানোর আগে বাবা-মাকে নিজে দ্বীন পালন করতে হবে এবং বাড়িতে একটি দ্বীনি পরিবেশ তৈরি করতে হবে ।
৫. জীবনযাপনে সালাতকে কেন্দ্রবিন্দু করা
সন্তানকে সালাতে অভ্যস্ত করার জন্য কেবল মৌখিক আদেশ যথেষ্ট নয়। শৈশব থেকেই শিশুকে দেখতে হবে যে তার বাবা-মার জীবন সালাতকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে ।
উদাহরণস্বরূপ:
কোথাও বেড়াতে যাওয়ার আগে আলোচনা করা যে, সেখানে সালাতের ব্যবস্থা কেমন এবং পথিমধ্যে কোথায় সালাত আদায় করা যায়।
মার্কেটে বা কেনাকাটায় যাওয়ার সময় সালাতের সময় মাথায় রাখা এবং ওজু করে বের হওয়া।
বাসায় মেহমান আসলেও ছোট শিশুকে সালাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া, তবে তা যেন জোরজবরদস্তি বা শাসনের মাধ্যমে না হয়।
যখন একটি শিশু দেখবে তার বাবা-মার প্রতিটি পরিকল্পনা সালাতকে কেন্দ্র করে হচ্ছে, তখন তার অবচেতন মনে সালাতের গুরুত্ব গেঁথে যাবে।
৬. ভালোবাসা ও সুন্নতি প্যারেন্টিং
সন্তানকে ভালোবাসা ও মমতা দিয়ে বড় করা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ। তিনি শিশুদের চুমু দিতেন এবং তাদের সাথে কোমল আচরণ করতেন। আমাদের সমাজে অনেক বাবা মনে করেন বড় সন্তানদের আদর করা বা চুমু দেওয়া অনুচিত, কিন্তু রাসূল (সা.) শিখিয়েছেন যে, যারা দয়া করে না, তাদের প্রতি দয়া করা হয় না। সন্তান বড় হলেও (এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া হলেও) তাদের কপালে বা মাথায় চুমু দেওয়া এবং ভালোবাসা প্রকাশ করা পরিবারের মধ্যে বারাকা বা কল্যাণ বয়ে আনে।
এছাড়া সন্তানকে সালাম দেওয়ার অভ্যাস করতে হবে। সালাম কেবল একটি সামাজিক সম্বোধন নয়, বরং এটি একটি গভীর দোয়া। বাবা-মা যখন অন্তর থেকে সন্তানকে সালাম দেবেন এবং শান্তি কামনা করবেন, তখন আল্লাহর রহমতে সেই সন্তানের জীবনে শান্তি ও প্রশান্তি নেমে আসবে।
৭. শাসনের সীমাবদ্ধতা ও জুলুম থেকে মুক্তি
সন্তান প্রতিপালন অত্যন্ত কষ্টকর কাজ, কিন্তু এই কষ্টের বিনিময়ে রয়েছে বিপুল সওয়াব। অনেক সময় মায়েরা সংসারের চাপে বা বিরক্ত হয়ে সন্তানদের গায়ে হাত তোলেন। ইসলামে শাসনের নামে শিশুর ওপর শারীরিক নির্যাতন বা 'জুলুম' করা মোটেও সমর্থনযোগ্য নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবনে কখনো কোনো শিশুর গায়ে হাত তোলেননি।
ইসলামি স্কলারদের মতে, শিশুকে শাসনের জন্য মারধর করা তখনই অনুমোদিত যদি তা সংশোধনের জন্য হয়, রাগের বশবর্তী হয়ে নয়।
মারধর করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন বগল দেখা না যায় (অর্থাৎ হাত যেন খুব বেশি উপরে না ওঠে) এবং শরীরে যেন কোনো দাগ না পড়ে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিজের রাগ বা অন্য কারো ওপর ক্ষোভ মেটানোর জন্য সন্তানকে মারা একটি বড় জুলুম, যার জন্য আল্লাহর কাছে বিচার দিতে হতে পারে।
৮. নেক সন্তান পেতে হলে নিজেকে নেককার হওয়া
সন্তানরা তাদের বাবা-মাকে অনুকরণ করে। যদি কোনো সন্তান পরিবারে গালাগালি করে, তবে বুঝতে হবে সে তার বড়দের কাছ থেকেই এটি শিখেছে। আমরা যদি চাই আমাদের সন্তান মিথ্যা না বলুক, গীবত না করুক এবং রাগ নিয়ন্ত্রণ করুক, তবে এই গুণগুলো আগে আমাদের নিজেদের মধ্যে অর্জন করতে হবে।
এমনকি সমাজের নিম্নবিত্ত বা সাহায্যকারীদের সাথে আমাদের আচরণ কেমন, তাও সন্তানরা সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করে। আমরা যদি ঘরের কাজের লোকের সাথে খারাপ ব্যবহার করি আর সন্তানকে স্কুলে দ্বীন শিখতে পাঠাই, তবে তার মধ্যে এক ধরণের হিপোক্রেসি বা মুনাফেকী তৈরি হতে পারে। তাই আদর্শ সন্তান পেতে হলে বাবা-মাকে আগে আদর্শ হতে হবে।
৯. হালাল উপার্জনের প্রভাব
সন্তানের রক্ত-মাংসে যেন হারামের প্রভাব না পড়ে, সেদিকে অভিভাবকদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। হারামের ব্যাপারে আপসহীন মনোভাব সন্তানের চরিত্রে বড় প্রভাব ফেলে। একটি উদাহরণ থেকে জানা যায়, এক বাবা বিদেশে সফরে গিয়ে তার সন্তানদের জন্য নামী দোকানের বার্গার কিনতে গিয়েও যখন শুনলেন তা হালাল নয়, তখন তিনি তা বাতিল করে দিলেন। যদিও ছোট বাচ্চাদের জন্য গুনাহ লেখা হয় না, তবুও তাদের হারামের প্রতি বিমুখ করা এবং হালাল বোধ তৈরি করা অভিভাবকদের দায়িত্ব।
১০. দোয়া: অভিভাবকের প্রধান হাতিয়ার
সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করার জন্য আমাদের নিজস্ব প্রচেষ্টা কখনোই যথেষ্ট নয়। কারণ বর্তমান বিশ্বের ফিতনা এতই ভয়াবহ যে, কেবল শিক্ষা বা শাসন দিয়ে তাদের রক্ষা করা কঠিন। তাই আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দোয়া করতে হবে।
প্রতিটি সালাতের সেজদায় এবং সালাম ফেরানোর আগে সন্তানের জন্য দোয়া করা উচিত।
কুরআনের বর্ণিত দোয়াগুলো যেমন: “রাব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আইউন...” নিয়মিত পাঠ করা প্রয়োজন।
সন্তানকে সালাতে প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য ইব্রাহিম (আ.)-এর সেই বিখ্যাত দোয়া: “রাব্বিজ আলনি মুকিমাস সালাতি ওয়া মিন যুররিয়্যাতি...” নিয়মিত পড়া উচিত।
সন্তানকে ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখার পাশাপাশি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং তাঁর কাছে হেদায়েত চাওয়া হলো সফল প্যারেন্টিংয়ের মূল চাবিকাঠি।
উপসংহার
সন্তান প্রতিপালন কেবল দুনিয়াবি কোনো কাজ নয়, এটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের সংখ্যা বৃদ্ধির এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মহান মাধ্যম। আমরা যদি আমাদের সন্তানদের আল্লাহর আমানত হিসেবে মনে করি এবং নিজেদের আচরণ ও দোয়ার মাধ্যমে তাদের গড়ে তুলি, তবে ইনশাআল্লাহ তারা একদিন আমাদের জন্য জান্নাতের উসিলা হবে। আমাদের লক্ষ্য হোক—নিজেদের এবং সন্তানদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করে জান্নাতের পথে পরিচালিত করা।
আল্লাহ আমাদের সকলকে আদর্শ অভিভাবক হওয়ার এবং আমাদের সন্তানদের নেককার হিসেবে গড়ে তোলার তৌফিক দান করুন। আমিন।
প্রিয় পাঠক, যদি লেখাটি আপনার উপকারে আসে দয়া করে সবার মাঝে শেয়ার করবেন এবং দোয়া করবেন ইন শা আল্লাহ্।
Md. Sahinur Rahaman (Sahin Sir)
English Teacher & Public Speaker