08
Jul
রাসুলুল্লাহর (সা) শৈশব ও মা হালিমার বরকতপূর্ণ দিনগুলো
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসূলুল্লাহ (সা)-এর শৈশব
জান্নাতে প্রথম প্রবেশকারী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জীবন থেকে কিছু অমূল্য ঘটনা
রাসূলুল্লাহর (সা) জন্ম ও অলৌকিকতা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, তাঁর জন্মের তারিখ ছিল ৯ই রবিউল আউয়াল, সুবে সাদেকের সময়। যদিও ২ বা ১২ই রবিউল আউয়াল নিয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে, তবে ৯ তারিখটিই বেশি সমর্থিত। তাঁর জন্মের সময় এক অপূর্ব নূরের প্রকাশ ঘটেছিল, যা শাম দেশের রাজপ্রাসাদসমূহকে পর্যন্ত আলোকিত করে দিয়েছিল।
তাঁর (সা) জন্মের সংবাদ শুনে দাদা আব্দুল মুত্তালিব খুশিতে আত্মহারা হয়ে যান এবং তাঁকে কোলে নিয়ে কাবার চত্বরে গিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। তিনি শিশুর নাম রাখেন 'মুহাম্মদ'। আরবের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সপ্তম দিনে তাঁর খাতনা করানো হয়।
মা হালিমার আগমণ ও সেই অভাবী দিনগুলো
তৎকালীন আরবের ঐতিহ্য ছিল শহরের শিশুদের মরুভূমির মুক্ত বাতাসে এবং বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শিখানোর জন্য ধাত্রী বা স্তন্যদাত্রী মায়ের কাছে পাঠানো। রাসূলুল্লাহকে (সা) সর্বপ্রথম দুধ পান করান আবু লাহাবের দাসী সোয়াইবা। এরপর আব্দুল মুত্তালিব একজন উপযুক্ত মহিলার সন্ধান করতে থাকেন।
ঠিক সেই সময়েই বনু সাদ গোত্রের মহিলারা মক্কার পথে রওনা হন দুধ পান করানোর জন্য শিশু খুঁজতে। এই কাফেলায় ছিলেন মা হালিমা, তাঁর স্বামী এবং তাদের এক সদ্যজাত সন্তান। হালিমার অবস্থা তখন ছিল অত্যন্ত করুণ। তিনি একটি অতি দুর্বল সাদা গাধার পিঠে চড়ে আসছিলেন, যা কাফেলার সবার পেছনে পড়ে যাচ্ছিল। প্রচণ্ড অভাব এবং খরা চলছিল তখন। হালিমার বুকে পর্যাপ্ত দুধ ছিল না, এমনকি তাদের উটের ওলানেও এক ফোঁটা দুধ ছিল না। ক্ষুধার জ্বালায় তাদের কোলের শিশুটি সারারাত কান্নাকাটি করত।
এতিম শিশুকে গ্রহণ ও বরকতের সূচনা
মক্কায় পৌঁছে কাফেলার প্রতিটি নারী কোনো না কোনো ধনী পরিবারের সন্তান খুঁজে পেলেন, যাদের বিনিময়ে তারা প্রচুর উপঢৌকন ও অর্থ আশা করছিলেন। কিন্তু হালিমা কোনো সন্তান পেলেন না। সেখানে তিনি এক এতিম শিশুর সন্ধান পান, যার বাবা দুনিয়াতে নেই, মা বিধবা আর দাদা অতি বৃদ্ধ। কাফেলার অন্য মহিলারা এই শিশুকে নিতে অস্বীকার করেছিলেন এই ভেবে যে, এতিম শিশুর পরিবার থেকে তেমন কোনো অর্থ পাওয়া যাবে না।
হালিমা প্রথমে দ্বিধায় থাকলেও খালি হাতে ফিরে যেতে চাইলেন না। তিনি তাঁর স্বামীকে বললেন, "আমি এই এতিম শিশুটিকেই নিয়ে আসি, হয়তো এর উসিলায় আল্লাহ আমাদের ভাগ্যে রহমত দান করবেন"
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হালিমার কোলে তুলে দেওয়ার সাথে সাথেই মিরাকল বা অলৌকিক ঘটনা শুরু হলো। হালিমা বলেন, তাঁকে বুকে নেওয়ার পর দেখা গেল তাঁর স্তনে দুধের জোয়ার চলে এসেছে, যা দিয়ে মুহাম্মদ (সা) এবং হালিমার নিজের সন্তান দুজনেই পরিতৃপ্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। স্বামী উটের কাছে গিয়ে দেখলেন, শুষ্ক ওলান দুধে টইটুম্বর হয়ে আছে। তাদের সেই অভাবী রাতটি এক আনন্দময় রাতে পরিণত হলো।
অলৌকিক সফর ও বনু সাদ গোত্রের সমৃদ্ধি
ফিরে আসার সময় সেই দুর্বল গাধাটি, যা আসতে সবার পেছনে ছিল, তা এখন এত দ্রুত চলতে শুরু করল যে কাফেলার অন্য সব শক্তিশালী প্রাণীকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল। অন্য মহিলারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "হালিমা! এটা কি সেই গাধা নাকি অন্য কিছু?"
হালিমার গৃহে রাসূলুল্লাহর (সা) উপস্থিতিতে রহমতের বন্যা বয়ে গেল। যেখানে চারদিকে খরা আর ঘাসের অভাব ছিল, সেখানে হালিমার বকরি ও উটগুলো চারণভূমি থেকে পেট ভরে খেয়ে ফিরে আসত এবং প্রচুর দুধ দিত। অথচ অন্যদের পশুরা ক্ষুধার্ত থাকত। বনু সাদ গোত্রের মানুষরা এটা দেখে অবাক হতো এবং তাদের পশুদেরও হালিমার পশুদের চারণভূমিতে নিয়ে যেত, কিন্তু তারা সেই বরকত পেত না। এভাবে অভাবী হালিমার সংসার প্রাচুর্যে ভরে উঠল।
সিনা চাক বা বক্ষ বিদারণ
রাসূলুল্লাহ (সা) অন্য শিশুদের মতো ছিলেন না; তিনি খুব দ্রুত এবং শক্তিশালী হয়ে বেড়ে উঠছিলেন। দুই বছর পূর্ণ হলে দুধ পান ছাড়ানো হয় এবং তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় আসে। কিন্তু তাঁর উপস্থিতিতে যে বরকত হালিমা পাচ্ছিলেন, তা থেকে তিনি বঞ্চিত হতে চাইলেন না। হালিমার অনুরোধে মা আমিনা তাঁকে আরও কিছুদিন নিজের কাছে রাখার অনুমতি দিলেন।
এই দ্বিতীয়বার অবস্থানের সময়ই বিখ্যাত 'সিনা চাক' বা বক্ষ বিদারণের ঘটনা ঘটে। একদিন খেলার মাঠে জিব্রাইল (আ) এসে মুহাম্মদ (সা)-কে মাটিতে শুইয়ে দেন এবং তাঁর বুক চিরে কলিজা থেকে এক টুকরো গোশত বের করে আনেন। জিব্রাইল (আ) বলেন, "এটি শয়তানের অংশ"। এরপর সেই অংশটিকে সোনার পাত্রে জমজমের পানি দিয়ে ধুয়ে আবার যথাস্থানে স্থাপন করে বুক জোড়া লাগিয়ে দেওয়া হয়। আনাস (রা) বলেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) বুকে সেই সেলাইয়ের দাগ দেখেছিলেন। এটিকে বিশ্বের প্রথম 'ওপেন হার্ট সার্জারি' হিসেবেও অনেকে অভিহিত করেন।
মায়ের কোলে ফেরা ও আমিনার ইন্তেকাল
বক্ষ বিদারণের ঘটনা দেখে অন্য শিশুরা ভয় পেয়ে হালিমার কাছে গিয়ে খবর দেয় যে মুহাম্মদ মারা গেছেন। হালিমা ভয়ার্ত অবস্থায় এসে দেখেন রাসূলুল্লাহ (সা) বিষণ্ণ মনে বসে আছেন। এই ঘটনার পর হালিমা কিছুটা শঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং শিশু মুহাম্মদকে (সা) তাঁর মা আমিনার কাছে মক্কায় ফিরিয়ে দেন। তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় ছয় বছর।
কিছুদিন পর মা আমিনা তাঁর প্রয়াত স্বামী আব্দুল্লাহর কবর জিয়ারতের জন্য মদিনা (তৎকালীন ইয়াসরিব) যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সাথে ছিলেন পরিচারিকা উম্মে আয়মান এবং ছয় বছরের মুহাম্মদ (সা)। সেখানে এক মাস থাকার পর মক্কায় ফেরার পথে 'আবওয়া' নামক স্থানে আমিনা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন। পিতা হারানো শিশুটি এবার মাকেও হারিয়ে পুরোপুরি এতিম হয়ে পড়লেন।
দাদা আব্দুল মুত্তালিবের ছায়াতলে
উম্মে আয়মান এতিম শিশুটিকে নিয়ে মক্কায় দাদা আব্দুল মুত্তালিবের কাছে ফিরে আসেন। নাতির এই অবস্থা দেখে দাদা অত্যন্ত মর্মাহত হন। তিনি মুহাম্মদকে (সা) নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। কাবার চত্বরে আব্দুল মুত্তালিবের জন্য একটি বিশেষ আসন থাকত, যেখানে তাঁর কোনো সন্তানেরও বসার সাহস ছিল না। কিন্তু ছোট্ট মুহাম্মদ (সা) নির্দ্বিধায় সেখানে বসে পড়তেন। চাচারা তাঁকে সরাতে চাইলে আব্দুল মুত্তালিব বলতেন, "আমার এই সন্তানকে সানিও না, আল্লাহর কসম, ও এক অনন্য মর্যাদার অধিকারী"।
কিন্তু ভাগ্যের লিখন, নাতির বয়স যখন আট বছর, তখন দাদাও দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর পুত্র আবু তালিবকে মুহাম্মদের (সা) দায়িত্ব দিয়ে যান। এরপর থেকে দীর্ঘ ৪০ বছর তিনি তাঁর চাচা আবু তালিবের কাছেই বড় হন।
উপসংহার
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শৈশব ছিল যেমন বরকতময়, তেমনি বিরহ ও কষ্টের পরীক্ষা দিয়ে ঘেরা। মা হালিমার সেই দরিদ্র সংসারে তাঁর আগমন যে রহমত নিয়ে এসেছিল, তা আমাদের শিক্ষা দেয় যে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের সান্নিধ্যই সৌভাগ্যের চাবিকাঠি। তাঁর এতিম হওয়া এবং জীবনের প্রতিটি স্তরে আল্লাহর বিশেষ তত্ত্বাবধানে বড় হওয়া আমাদের জন্য ধৈর্যের এক মহৎ দৃষ্টান্ত। আসুন, আমরা তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেই এবং তাঁকে আমাদের জীবনের একমাত্র আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করি।
❤️ প্রিয় পাঠক, যদি লেখাটি আপনার উপকারে আসে দয়া করে সবার মাঝে শেয়ার করবেন এবং দোয়া করবেন ইন শা আল্লাহ্।
Md. Sahinur Rahaman (Sahin Sir)
English Teacher & Public Speaker
বাংলা ব্লগ · রাসূলুল্লাহ (সা) এর শৈশব